হারানো স্বর্গের খোঁজে।


আজও মনে পড়ে সেই শৈশব দিনগুলোর কথা, যখন ইশকুল পালিয়ে খেজুরের রস চুরি করতে বের হতাম। একটু বড় হলাম, তখনও বাবাকে টেলিফোন অফিস থেকে ফোন করার জন্য যেতাম।


বিকেলে বন্ধুদের সাথে পাহাড়ের চুড়াতে বসে গল্প করতাম, আর ভাবতাম হয়তো নারিকেল চুরি করবো গ্রামের কোন গাছ থেকে। সূর্যাস্তের পর মেঠোপথ ধরে ধীরে ধীরে গ্রামের হাট পেরিয়ে বাড়িতে পৌঁছতাম। ঘরে ফিরে দেখি মা ভাপাপিঠা করছে। কি যে হবে, খুশিতেতো নারিকেল চুরির কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। চুলোর সামনে বসে আগুনের তাপ শীতে যেন প্রাণ এনে দিচ্ছিল। সবাই মিলে খেজুরের রস দিয়ে খেলাম অমৃতসম ভাপাপিঠা। না, অইদিকে বন্ধুরা ডাকছে নারিকেল চুরি করতে যাওয়ার জন্য। গিয়ে দেখি ওরা তিন ব্যাটারির টর্চ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঘরের দোরগোড়াতে।


রাতে দারুণ ঘুম হলো ভারী লেপের আড়ালে। সকালে বের হলাম ঘাসের উপর ভোরের আলোতে শিশিরবিন্দু দেখতে। শিশিরবিন্দু দেখেই দিলাম পুকুরে ডুব, সাঁতরে পুকুরের মাঝে গিয়ে মাটি তুলবো পুকুরের মাঝখান থেকে।


এটা না করলে কেন যেন দিনটাই ভালো যেতো না। হঠাৎ দেখি বাবা দাঁড়িয়ে আছেন পুকুর ঘাটে। বাবাও পুকুরে নেমেছেন আমাকে ধরে তুলে ইশকুলে পাঠানোর জন্য। এখন বাবাও আমাকে ধরার চেষ্টা করছেন আর আমিও ডুব দিয়ে অন্য কোথাও পালিয়ে বেড়াচ্ছি। একসময় ক্লান্ত হয়ে উঠে এলাম।

এখন তো আমি ইশকুলে বসে আছি আর ভাবছি কিভাবে পালাবো ইশকুল আজ, কারণ বাইরে কোথাও একটা মেলা হচ্ছে। মাইকে শুনছিলাম পুরনো দিনের গানগুলো, ওটাতো মেলা থেকেই আসছিলো। ক্লাসের ঘণ্টা বাজলো আর এখন আমি আর আমার বন্ধুরা ইশকুল পালাবো। কিভাবে বর্ণনা করবো আমি আমার এই খুশি এই মেলা দেখে? চালতার আঁচার খাচ্ছি আমি আর ভাবছি যাবো এক পালা-কীর্তনে। কি হয় যদি ইশকুলে ফিরে না যাই?


কলাপাতার থালাতে পেটপুরে খেলাম স্বর্গীয় প্রসাদ। আমিতো অনেক বড় হয়ে গেছি, কলেজে পড়ি। তখন আমি শহরে, কেন যেন হটাৎ এক ভিন্ন জীবনে প্রবেশ।


মন কাঁদছিল গ্রামের দিনগুলোর জন্য। ধীরে ধীরে শহরেই বসবাস শুরু হল। একদিন দেখি ওরা বলাবলি করছিলো কক্সবাজারে নাকি মোবাইল ফোন আসছে! আশ্চর্য! জীবনে কখনো মোবাইল ফোন দেখিনি এর আগে। ঠিকই একদিন দেখলাম ওরা মোবাইল ফোনের অফিস চালু করেছে। ভয়ে হয়তো বা কোন ধরনের লজ্জার কারণে যাইনি ওই অফিসে। একদিন দেখি কে যেন তটরেখা ধরে হেঁটে চলে যাছে মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে। আছা, এটাই তাহলে সেই মোবাইল ফোন, এটা তো আমি জীবনে প্রথম দেখেছি আজ। আমি লোকটার পিছু নিয়েছিলাম শুধু একবার মোবাইল ফোনটা দেখতে। যখন সে ফোনটা দেখাল তখন খুব নার্ভাস লাগছিলো। এই পৃথিবীতে কেও কি জানতো এই মোবাইল ফোনই হবে একদিন মহাবিপদ ও ধ্বংসের মূল কারণগুলোর একটি?


সময় পেরিয়ে গেলো অনেকদূর। এইতো সেদিন গ্রামে মামার বাড়িতে বেড়াতে গেলাম, এটাই তো সেই গ্রাম যেখানে আমি শৈশবের একটা বড়ো সময় কাটিয়েছি, আর দেখেছিলাম সেই শিশিরবিন্দুগুলো ভোরের আলোতে।


কেন যেন বুক চিরে একটা গভীর কান্না আসে। কিভাবে বোঝাবো আমি এই প্রযুক্তি জগতের আচ্ছাদনে? সবকিছু কেমন যেন হটাৎ করে হারিয়ে গেলো। সবাই দেখছি সেই বিষাক্ত মোবাইল ফোন আর ইন্টারনেট নিয়ে বিচ্ছিন্ন সমস্ত পরিচ্ছন্ন আলাপ থেকে। কার অভিশাপ এটা এই স্বর্গসম পৃথিবীর উপর?

এখনো তো সময় আছে ফিরে যাবার, সেই গরুর গাড়িতে চড়ে পুরনো অতীতে। আমি কি দেখতে পাই ভবিষ্যৎ? যদি দেখি, তবে আমি কি দেখি এই প্রযুক্তি অভিশাপে জর্জরিত পৃথিবীর ভবিষ্যৎ? আমি কি এখনো বুঝতে চাইনা যে এই পৃথিবীর অভিশপ্ত ভবিষ্যতের সাথে জড়িয়ে আছে আমার ভবিষ্যতও? আমি কি সেই লোক যে নিজের আরামের জন্য পৃথিবী ধ্বংস করবো? কারণ আমি জানি একদিন আমি নিশ্চয়ই মরে যাবো, তাহলে কেন আমি চিন্তা করবো আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ পৃথিবী নিয়ে? আমি তো তাকে এই প্রযুক্তির পৃথিবীতে অভ্যস্ত করছি সেই পুরনো দিনের কথাগুলো তাকে না বলে বলে।

হয়তো কোনদিন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানবেও না সেই স্বর্গীয় সময়, সেই স্বর্গীয় অনুভূতিগুলো যেগুলো সেই শিশিরবিন্দুর সাথেই ছিল। এখন এটা তো বিষাক্ত পৃথিবী, আমি কেন যেন অলস হয়ে গেছি, কারণ আমিও এই প্রযুক্তির অভিশাপে জর্জরিত। অথচ এটা তো আমারও দায়িত্ব সেই পুরনো পৃথিবীকে ফিরিয়ে আনা।

আপনি কি আমার সাথে সেই পুরনো স্বর্গে বিশ্বাস করেন? তাহলে কিভাবে করবো এই অভিশাপ মোচন? কি হারিয়েছি আমরা তা হল স্বর্গীয় সবুজ প্রকৃতি, কি পেয়েছি আমরা তা হল এই অভিশপ্ত প্রযুক্তি। এখন সহজেই বুঝতে পারবো কোন পথে এগিয়ে যাবো আমরা।


Leave a Reply