সবুজের স্বচ্ছতা।


যুগের পর যুগ ধরে পুরনো পুকুরটার গভীর জলে ছিল সবুজের স্বচ্ছতা। খেজুর গাছের ঘাটের সিঁড়িতে বসে জলে পা ডুবিয়ে রেখেছি তখন।


স্কুল থেকে ঘরে ফিরেই প্রথমেই যে যেতে হতো পুকুর ঘাটেই। ওই পাড়ে হলদে পাখিগুলোর কলতানে মুখরিত বিকেল গুলোতে গোধূলির আভা ছিল আঁকা ছবির প্রতিচ্ছবি যেন।

জলের পাশেই নির্ভয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল ধবল বকের পরিবারটা। ওরা আমার খুব পরিচিত।

পুরনো সাইকেলের ঘণ্টির শব্দটা সরু রাস্তাটার কোথা হতেই আসছিল। হয়ত আমাদের পাশের বাড়ির দাদা দোকান থেকে ঘরে ফিরছেন। বুঝতেই পারিনি এখন যে ভর সন্ধ্যা। উনিই তো আমাকে সাইকেল চালানো শিখিয়েছিলেন গত শীতে। কাল স্কুল বন্ধ, আমি সাইকেলটা চালিয়ে যাবো দূর গাঁয়ের হাটে ওই ভর দুপুরেই।

তখন তো বিজলী বাতি শুধু বড় শহরেই দেখেছি কয়েকবার। তবে, মাঝে মাঝে দেখতাম, দুরে বিলের কোথাও বিদ্যুতের কাঠের খুঁটিগুলো বসানো হচ্ছিল। কেমন যেন বেমানান মনে হছিল বিদ্যুতের খুঁটিগুলো ওই নিষ্পাপ প্রকৃতির মাঝে। ওই বিদ্যুতের খুঁটিতে বিদ্যুতের লাইন লাগানো হল কোন এক সময়। এখন বিলের পাখিগুলো তো ওই বিদ্যুতের লাইনেই বসে।


এখন এসেছি আমি হাটে, দাদার পুরনো সাইকেলটা নিয়েই। গ্রামের কৃষকদের কোলাহলে পুরো হাট ছিল মুখরিত। এগুলো যে চির মুগ্ধ দিনগুলোর একটি। আমাদের পাশের বাড়ির ছেলেটার সাথে দেখা হয়ে গেল হাটেই।


সন্ধ্যায় ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঘরে ফেরার সময় অনেকেই নাকি ভুত পেত্নীদের দেখেছে ওই দিঘীর পাড়ে। ভালোই হল, এখন একসাথে বাড়ি ফিরব।

ও সাইকেলটা চালাচ্ছিল আর আমি পিছনে বসে কেরোসিনের হারিকেনের আলোয় পথ দেখাচ্ছিলাম। মাঝে মাঝে দেখছিলাম, শিয়াল বা বেজীগুলো রাস্তা পার হয়ে অন্য গাঁয়ে যাচ্ছিল হয়ত।

একটা ছোট বঁড়শি কিনেছি আমি ওই হাট থেকে পনের পয়সা দিয়ে। আর কিনেছি বঁড়শির সুতো, বাবার দেওয়া ওই আধুলিটা দিয়ে। রাতের খাবার শেষে কেরোসিনের আলোয় বঁড়শিতে সুতো লাগানোর সময় শুনছিলাম ঘরের কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা সুর। এই ডাক না শুনলে কেন যেন মনে হতো বেঁচে নেই আমি হয়ত। ঘুম থেকে উঠেই পুকুর পাড়ের বাঁশঝাড়ে গিয়ে নেব ছোট একটা বাঁশ। এটা দিয়েই বানাবো বঁড়শির ছিপটা।

এগুলো ছিল আমার আর অতীতের কোথাও বেড়ে ওঠার সময়গুলোর একটা সময়। এটাই ছিল পরিচিত শৈশব। এই স্মৃতিগুলো এখন মনের গহীনেই বেঁচে আছে কোথাও। তেমন একটা মনেও পড়ে না হয়ত বা স্বার্থপরের মতো ভুলে যেতে চাই এসব গেঁয়ো অতীত। তাহলে আমি কি সুখী এখন এই আধুনিক পৃথিবীতে? না, আমি সুখী নই এই বর্তমানে। কিন্তু, ওই অতীতেই সুখী ছিল এই পৃথিবী। তাহলে আমি ফিরছি না কেন ওই অতীতে?

এটাই কি কারণ হতে পারে যে, আধুনিক দামী বস্ত্র, দামী পারফিউমের সভ্যতায় নিষ্পাপ গ্রামীণ কাপড়ে, ঘ্রাণে আমাকে বড় শহরে বেমানানই লাগছিলো?