ধাতব সভ্যতার নিষ্প্রাণ ভোর।


ভাবছি গ্রামের মেঠো পথের কোথাও পুরনো বটগাছটা কেটে ওখানে ধাতব একটা দোকান গড়বো আমি। কি হবে ঐ বটবৃক্ষের স্মৃতিতে আচ্ছাদিত হয়ে?


আমি তো শৈশবে বড় হয়েছি ঐ প্রাণপ্রিয় বটবনের কোথাও। আমার প্রাচীন অতীতের কোথাও সেই বটবৃক্ষের শেকড় যে গভীরে নিহিত। আমিই তো কেও সে, ঐ বটবৃক্ষের ছায়ার আশ্রয়ে যে বসতো কোন ভর দুপুরে। প্রখর গ্রীষ্মের বিদীর্ণ মেঠো প্রান্তরে ঐ বটবৃক্ষই ছিল প্রকৃতির মাতৃ আঁচল।

রিপুর প্রলোভনে প্রকৃতি মাতার বিশ্বাসহন্তা পুত্র আমি আজ। এটা কি জাগতিক মুদ্রার জন্য হত্যা করবো ভেবেছি আমি ঐ প্রাচীন বটমাতাকে, অথবা ভেবেছি এক চোখ ধাঁধানো যান্ত্রিক পৃথিবী গড়বো আমি ঐ দোকান গড়ে, এমনও হয়ত ভেবেছি, জীবনের গতিপ্রবাহ করবো আমি সহজ কিন্ত, এই আধুনিক সভ্যতা প্রতিষ্ঠায় ঐ বটবৃক্ষই যে একমাত্র প্রতিবন্ধকতা? জেনেও এড়িয়ে যাচ্ছি, আমার ঐ দোকান হবে নতুন কোন এক ধ্বংসের সূচনামাত্র। শৈশবে শিখেছি, “সব ধ্বংসই নতুন সৃষ্টির জন্মদাতা”। এই শিক্ষার অপপ্রয়োগে ধ্বংস করবো আমি ঐ বটবৃক্ষ, ওখানে সৃষ্টি করবো আধুনিক সভ্যতার সূর্যোদয়। এটাই হবে সেই অভিশপ্ত সূর্য, যার খরতাপে চৌচির হবে প্রকৃতির আদিম প্রাণ বৃক্ষহীন এই শহুরে সভ্যতায়। অতীতের স্বর্গের অভিশাপে গড়ে উঠবে অচলপ্রায় আধুনিক সভ্যতা। এটা আসলে নতুন কি কি সৃষ্টি করবে অদুরের পরিণামে যেখানে প্রতিটি ধ্বংসই সৃষ্টি করবে নতুন এক ধ্বংস?


বিষাক্ত এই আধুনিক শহরের অতীত দর্শনে ফিরে যাবো আমি শতবর্ষ পেছনে যেখানে খুঁজে পাবো ঐ মাতৃহৃদয় গ্রামগুলোকে। যেখানে দাঁড়িয়ে আছি আমি এই বিরক্তিকর আধুনিক সভ্যতায়, এখানেই তো ছিল অতীতের স্বর্গ।


কৃত্রিম শান্তির আশায় অক্লান্ত এক ব্যর্থ পরিশ্রমে সৃষ্ট এই আধুনিক পৃথিবীতে প্রতিটি প্রাণই নীরবে খুঁজছে আজ অকৃত্রিম শান্তি। কিন্তু, আমার চির লোভী অস্তিত্ব ঐ গ্রামীণ স্বর্গে খুঁজেছে ধ্বংসের বাহক কৃত্রিম কোন এক শান্তির প্রেতাত্মাকে, প্রযুক্তি আনবে প্রকৃত শান্তি এই বিশ্বাসে। 

আমি তো বুঝেও বুঝিনি, প্রযুক্তিই ছিল এই কৃত্রিম কোন এক শান্তির প্রেতাত্মা। এই প্রযুক্তিকে বিশ্বাস করেই তো ধ্বংস করবো ভাবছি ঐ বটমাতাকে। প্রকৃতির প্রাণ যে এই বৃক্ষ, ভবিষ্যতের চির বৃক্ষহীন সময়ে পৃথিবী কি ফিরে পাবে এই হারানো প্রাণ? এই প্রাণ যে আমাদেরও প্রাণদাতা।

পাঠশালায় আজ শিখেছি, বৃক্ষের মৃত্যুতেই হবে পৃথিবীর মৃত্যু।


Leave a Reply