দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা…


দিঘীর জলে স্ফটিকস্বচ্ছ বৃষ্টির ফোঁটাগুলো দেখছিলাম ওইদিন। কিন্তু, ডায়েরির তারিখ দেখে বুঝলাম এটা ছিল ৩৫ বছর আগে কোন এক বর্ষায়।


অগুনতি আধুনিক জীবনের সামগ্রীগুলোর মাঝে কোথাও খুঁজে পাই না এখন যা খুঁজছি তা। সেদিন গ্রামে গিয়ে আমি অবাক। কিছু আগের বছরেও ওখানে ছিল প্রাকৃতিক মানুষগুলোর নিষ্পাপ কোলাহলে মুখরিত এক স্বর্গীয় প্রকৃতি। আজ সারি সারি তালাবদ্ধ মাটির ঘরগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে কি বুঝতে পারছি আমি? সবাই তো এখন শহরেই চলে এসেছে প্রযুক্তির মিথ্যা স্বপ্নের প্রতিশ্রুতিতে। গ্রামের ওই নিষ্পাপ স্বর্গে প্রযুক্তি যে চির মূল্যহীন এটা প্রথমে বুঝতে পারছিলাম না ওই মুঠোফোনটা হাতে নিয়ে।

নিকটের হারানো দুরের একটা সময়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গ্রামের নদীটার পাশে প্রায় ভেঙেপড়া ওই চা এর দোকানে বসে গ্রামের কৃষকদের সাথে নদীর স্রোতের দিকে তাকিয়ে থাকা সময়গুলোতে ছিল নিঃস্বার্থ ভালোবাসার উপস্থিতি। চা এর দোকানের ওই কোনায় ছিল একটা পুরনো বেতার। ওই বেতারের সুর কখনো বিমুখ করেনি আমাকে বা কাওকে। যা চেয়েছিলাম তার চেয়েও অনেক বেশী ভালো কিছুই পেয়েছি ওই অতীতে।


এগুলো যে সবার উপর স্বর্গের আশীর্বাদ ছিল, আমি তা বুঝতে চেষ্টাও করিনি। চেষ্টা করিনি কারণ আমার দৃষ্টিসীমায় আছে প্রচুর সীমাবদ্ধতা।


এই সীমাবদ্ধতার একমাত্র কারণ আমার অকৃত্রিম স্বার্থপরতা। আমি একমাত্র সেখানেই যাই বা কারো সাথে দেখা করি বা কথা বলি যেখানে আমার লাভ বা আর্থিক উন্নতি হবে। এই স্বার্থপরতা আমার ঠিক কি উপকারে আসবে এটা জানা আমার নিষ্প্রয়োজন। আমার স্বার্থপরতার সৃষ্টি আমার অন্তর্নিহিত রিপুগুলোর সাহচর্যে। আমার স্বার্থপরতাটা হল, আমি সবসময় চেয়েছি একটু বেশী আরামের জীবনে আরও ভালভাবে বেঁচে থাকতে এবং এসব ভালকিছু শুধু আমার জন্যই, পৃথিবীর অন্য কেও কিভাবে বাঁচবে এটা আমার জানার বিষয় নয়। আমি কি অতীতেও বেঁচে থাকিনি? পার্থক্যটা ছিল, আমি অতীতে বেঁচে ছিলাম সবাইকে নিয়ে, সবাইকে ভালবেসে। আর এখন বাঁচি আমি শুধু নিজেকে ভালবেসে। এই কারণেই যে হারিয়ে গেল স্বর্গ চোখের সামনেই।

কিন্তু, অতীত হারিয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছি অতীতকে এখন। অতীতের নদীর তীরের ভাঙা ওই পুরনো চা এর দোকানের পৃথিবীতে ছিল না স্বার্থপরতার স্পর্শ। তাই সবাই ছিল স্বর্গের আশীর্বাদপুষ্ট। মুঠোফোনের উপস্থিতিতে দু’চোখ ভরে দেখি একাকীত্বের এক অপ্রয়োজনীয় দৃশ্য সর্বত্রই। এখানেই দেখতে পাচ্ছি অতীতের স্বর্গের আশীর্বাদের মাতৃহৃদয় আর এই আধুনিক সময়ে একই মায়ের দেওয়া অভিশাপের ভয়াবহ পরিণতি। কেন বুঝতে পারছি না, প্রকৃতির সামনে যেকোনো প্রযুক্তিই যে অচল যে কোন মুহূর্তে?

এখনো কি আধুনিক পৃথিবীতে মনে পড়ে অতীতের পাহাড়ে ছিল পাহাড়ি ঝর্ণার দামাল স্রোত? আর ওই স্বর্গের স্রোতেই ভেসে এসেছি আমি আজ এই ৩৫ বছর পরের পৃথিবীতে যেখানে একমাত্র প্রযুক্তিকেই মনে প্রাণে বিশ্বাস করি। কিন্তু, ভেসে আসার সময় স্বর্গ দেখিয়েছিল সব ভালো কিছু। এখনো কি দেখি কোথাও, পাহাড়ের নীল হ্রদটায় বালিহাঁসদের উপস্থিতি ছিল জলের অলঙ্কার?