তখনও সূর্যোদয় হয়নি।


ভোরের ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা ছিল শীতের পৃথিবী। উঠোনে দাঁড়িয়েই দেখছিলাম গরুর পাল নিয়ে লাঙ্গল কাঁধে কুয়াশার চাদরেই দ্রুতই হারিয়ে যাচ্ছিলো কৃষকেরা।


 

আসলে, ওরা যাচ্ছিল এই নতুন সময়ে যেখানে আমি দাঁড়িয়ে এখন।

উঠোনের কোথাও খড়কুটোর আগুন ঘিরে গরম চা ছিল অমৃত। তখনো হেঁটে যাচ্ছিল গরুর পাল দূর গাঁয়ের কৃষকদের পাশেই। কিন্তু, ওদের চোখে জল কেন? এমনকি গরুগুলোর দিকে তাকিয়েও দেখেছি ওই অশ্রু। তখন তো আমি বড়দের স্কুলে পড়ি।

এরপর প্রায় সবসময় দেখেছি ওই অশ্রু। পাখিদের চোখেও ছিল ওই অশ্রু।

কেন যেন কলেজের সময়ে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছিল ওই অশ্রু।

তখনও বুঝিনি, এই মুহূর্তে যেখানে দাঁড়িয়ে আছি ঠিক সেখানেই যাচ্ছিলাম। সবাই ও যাচ্ছিল ওখানে।

অশ্রু হারিয়ে যাচ্ছিল কারণ আমাদের মায়া-মমতা বোধ হারিয়ে যাচ্ছিল প্রতিদিন প্রকৃতির বিলুপ্তির সাথে। আমাদের জড় জীবনের প্রারম্ভে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কৃতজ্ঞতা বোধটুকুও যে হারিয়ে ফেলেছি তখন। এটা হচ্ছিল, কারণ তখন আমরা প্রযুক্তিনির্ভর সুখের স্বার্থে প্রকৃতিকে বিসর্জন দিতে কুণ্ঠাবোধ করিনি মোটেও।


কখনও তো ভেবেও দেখিনি, প্রকৃতিই যে আমাদের একমাত্র আশ্রয়। ধীরে ধীরে নিজের পায়েই কুড়ালের প্রতি কোপেই কেটে ফেলছিলাম নিজেরই অস্তিত্বকে।


 

কিন্তু, ভাবছিলাম কই আমার ক্ষতি তো কিছুই হয়নি আসলে। এটাই ছিল মহাভুল।

এখন ঠিক এখানেই দাঁড়িয়ে দেখছি পৃথিবীর প্রকৃতির বিলুপ্তির আভাষ। অতীতের চোখে নীরব অশ্রু ছিল বর্তমান নিষ্প্রাণ পৃথিবীর পূর্বাভাস। অতীতের অশ্রুতে প্রকৃতি সবাইকে বলেছিল নীরবে, আমরা যে হারিয়ে যাচ্ছি চিরতরে শুধু তোমাদের ভুলের কারণেই ।

কিন্তু, আমি এটাও জানি, প্রকৃতি ধ্বংস হচ্ছে না আসলে, আমরাই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছি। এটা জানার পরও কেন আরও দ্রুত ধ্বংস করছি অতীতের ক্ষীণ চিহ্নটুকুও সেটাই আশ্চর্যের বিষয়। এখানেই তো বুঝতে পারছি আমার অকৃতজ্ঞতা যে সৃষ্টির চেয়েও বিশাল।

আমাদের প্রযুক্তির বর্মই যে আমাদের ধ্বংসের মূল কারণ। কিন্তু, আমরা এখনও পারি ওই কুয়াশাঘেরা শীতের ভোরে ফিরে যেতে যেখানে ছিল অতীত, ওই অতীতের কথাই বলছি আমি যেখানে মেঠো উঠোনের কোথাও বসে ছিলাম সবাই ওই খড়কুটোর আগুন ঘিরে। হয়ত তিন যুগ আগে কোথাও।