কোথায় যাবো আমি?


বহু বছর আগে কোথাও মফস্বল শহরটার পাশেই বয়ে যাচ্ছিল ওই গভীর সবুজ জলের খালটা।


সকালে গিয়ে দেখি, খালের মাঝেই মাচা বেঁধেছে ওরা মাছ ধরবে বলে। ওখানে ছিল ওই বড় জালটা। এটা দিয়ে ওরা মাচায় বসেই মাছ ধরবে। তখন তো আমি ছোট, খুব ভালবাসত ওরা আমাকে, ওই তো আমাদের পড়শি চাচা তৈরি করেছিলেন ওই মাচাটা। উনি বললেন, রাতে ওখানেই থাকবেন আর মাছ ধরবেন ওই ত্রিকোণ জালটা দিয়ে। আমি তো মহাখুশি। উনি ছিপ নৌকাটা বেয়ে মাচায় যেতেন। আমি তখন বসে ওই নৌকাতেই। খালের জলে ছিল শীতের প্রাণ।

বাবা বলেছিলেন উনিও থাকবেন আমাকে নিয়ে চাচার সাথে রাতে একদিন অই মাচায়। বাঁশের মাচায় বাবা আর চাচা মাটির উনুনে তখন রান্না করছিলেন। স্রোতের কোথাও বসে খেলাম অতীতের প্রসাদ। এই প্রসাদের স্বাদ যেন অমৃতকেও হার মানায়।

দিন শেষে রাত হয়ে এলো প্রায়, গোধূলির নিষ্প্রভ আভায় তখন দেখছি ওই অকৃত্রিম পৃথিবী। আকাশে তো তারা দেখছি না কোথাও। শীতল বাতাস বইতে শুরু করল, এখন খুব বৃষ্টি হচ্ছে। বাবার পুরনো টর্চটা দিয়ে মাচার প্রান্তে ভিজে ভিজে খালের জলে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো দেখছিলাম। বাবা আর চাচা তো তখন রাতের রান্নায় মগ্ন।


খালের ওই বাঁকের কাছেই ছিল বেদে নৌকাগুলো।


একটু দুরের মিটমিটে আলোগুলো ওদের নৌকা থেকেই প্রতিফলিত হচ্ছিল খালের জলে। কোন এক বাদ্যযন্ত্রের সুরে ওরা গাইছিল তখন। মাচায় বসে সবাই নিকষ অন্ধকারেই শুনছিলাম ওই প্রাণস্পর্শী সুর।

আমি এখন যাব জেলেদের ডিঙ্গিতে, উনুন ঘিরে রান্না করবো ওদের সাথে ওই নৌকাতেই বসে। ওরা একটু আগেই রূপালী মাছগুলো ধরল ওই জাল দিয়েই। আপনি কি বলতে পারেন নৌকাগুলো এখন কোথায়?

হঠাৎ ওই অতীতের নিকটের কোন এক সময়ে স্বর্গে এলো ঝড়। প্রযুক্তির এই ঝড়ে দ্রুতই হারিয়ে গেল স্বর্গ। ঝড় শেষে চারিদিকে দেখি, আমি তো মৃতপ্রায় জড় পৃথিবীর কোথাও এখন। অথচ, ওই প্রাণের সুরের প্রাচীনে এখানেই তো ছিল স্বর্গ যেখানে পৃথিবী ছিল অনুপস্থিত।