এখনো কি মনে পড়ে?


পত্রালাপের অতীতের পৃথিবীতে স্কুল শেষে ডাকঘরে যেতাম ডাকটিকেট সংগ্রহে। এটা না করলেই যেন নয়। বন্ধুদের তো বলেই রেখেছি, পত্র বাড়িতে এলেই যেন খাম থেকে ডাকটিকেটগুলো আমার জন্য তুলে রাখে।


বাবার দেওয়া টিফিনের পয়সাগুলো জমিয়ে এক দিস্তা সাদা কাগজ কিনেছিলাম ঐ দিন, একটা খাতা তৈরি করবো বলে। এটাতেই আমি ডাকটিকেটগুলো লাগাবো।

একদিন তো ভুলে স্কুল এর শিক্ষককেই স্কুলের বাড়ির কাজের খাতাটা মনে করে ডাকটিকেটের খাতাটাই দিয়েছিলাম। মহা বিস্মিত দৃষ্টিতে শিক্ষক তো আমার দিকে তাকিয়েই বললেন, “মনোযোগ কোথায় তোমার, এভাবেই কি লেখাপড়া করবে তুমি?”

সেদিন স্কুল শেষে বাড়ি ফিরছিলাম, হঠাৎ দেখি স্কুলের ঐ শিক্ষক আমার সামনেই দাঁড়িয়ে। ভয়ে নীল হয়ে গেছি আমি। আজ মরেই যাবো হয়ত ঠিক এখানেই।

কিন্তু, ভয়মিশ্রিত বিস্মিত চোখে দেখি, উনি পুরনো থলিটা থেকে বড় খাতাটা বের করে আমার হাতে দিলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ভয় নেই, দেখ তুমি এটা। 

তখনও ভীত আমি, কাঁপা হাতে খাতাটা খুলে দেখি, ডাকটিকেটের বিশাল অ্যালবাম ওটা। এতো ডাকটিকেট আগে কখনো দেখিনি, আর এই ডাকটিকেটগুলোর একটাও তো আমার সংগ্রহে নেই। উনি তখন বললেন, দেখ, ডাকটিকেট সংগ্রহ আমারও খুব পছন্দের। আমার অনেকগুলো ডাকটিকেট সংগ্রহের খাতা আছে, এটা তোমার জন্য।


খাতাটার একটা পৃষ্ঠায় লিখা ছিল, “যখন তুমি বড় হবে তখন তোমার সংগ্রহগুলোও দেবে নতুন প্রজন্মকে। ওরা শিখবে আদিম পৃথিবীর নিষ্পাপ অতীত।”


এটাই ছিল অতীতের পৃথিবী, যেখানে সবাই ছিল এক পরিবারেরই যেন। সময়ের অভিশাপে হারিয়ে গেল অতীত, হারিয়ে গেল কারণ ওটা অপ্রয়োজনীয় ভেবেছি অপ্রয়োজনীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষায়। ভেবেছি আরও ভালো কিছু করবো এই পৃথিবীতে। এই ভালো কিছু করার স্বপ্নেই তো আবিষ্কৃত হল বৈদ্যুতিক যোগাযোগ, বৈদ্যুতিক পত্রালাপ, ইত্যাদি।

ডাকঘরগুলো হারিয়ে গেল, অথবা এখনো আছে বা নেই হয়ত।

সেদিন ঘর ঝাড়ু দিতে গিয়ে কবেই শুকিয়ে যাওয়া দোয়াতটা দেখলাম হঠাৎ। ওটা স্কুলে নিয়ে যেতাম পরীক্ষার সময়। ঐ দোয়াতের সাথে একটা কলমও কিনে দিয়েছিলেন বাবা। কলমটা আছে এখনো। মাঝে মাঝে দেখি ওটা।

কোন অভিশাপে হারিয়ে গেল ওই অতীত, এবং কিসের আশায় গড়া এই ভবিষ্যতের বর্তমান? বৈদ্যুতিক প্রযুক্তির অভিশাপ এটা, এ যেন বর্তমানের ক্ষণিকের সুখের আশায় ভবিষ্যতের চির অসুস্থ এক পৃথিবী। কারণ, অতীতের স্বাস্থ্যকর প্রকৃতি হারিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়তই।