উজ্জ্বল আলোর চাকচিক্য।


ঘোর বর্ষায় নদী পার হচ্ছিলাম ছোট ওই নৌকাটায়। শান্ত ওই কর্দমাক্ত নদীর জলে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো অবর্ণনীয় সুন্দর এক আঁকা ছবি। শুশুকদের একটা দল ডুবসাঁতারে আমাদের সাথেই যেন যাচ্ছিল ওপাড়ে।


ধীরে ধীরে আকাশ আরও ঘন মেঘে ঢেকে গেল। ভারী বৃষ্টির অজানা প্রকোপ বেড়েই চলছিল, এখন তো বৃষ্টির ফোঁটাগুলো বেশ বড়। আশেপাশে কিছুই দেখছি না আর। মন চাইছে না ওপাড়ে যেতে বা ফিরে যেতে। পুরো জীবনটাই যদি ওই নৌকায় এই বৃষ্টিতে কেটে যেত ঠিক এখানেই ! কখনো ভাবিনি এতো সুন্দর হতে পারে প্রকৃতি।

জানি না কখন পৌঁছে গেছি ওপাড়ে। আমি তখন ওই পাড়ে শহরে এসেছি আধুনিক জীবনের সম্মোহনে মুগ্ধ হয়ে। নিকটের দুরে বেশ কিছুটা পিছনে ফেলে এসেছি নদীটা, সাথে বৃষ্টির ফোঁটাগুলোর প্রতিটি স্মৃতিও।


শহরের উজ্জ্বল আলোর চাকচিক্য, দামী বস্ত্র পরিহিত সময় দেখে অতীত মনে পড়ে না আর আমার। আমি এখন শহরেই থাকি।


অনেকগুলো গ্রীষ্ম তো শহরেই কেটে গেল আমার। কিন্তু, এরই মাঝে সময় করিনি গাঁ’য়ে যাবার। এইতো সেদিন, গ্রামের কোন এক আত্মীয়ের বিয়েতে আমাকে যে গ্রামে যেতেই হবে।

এখন আমি গ্রামে, কিন্তু, এটা তো শহর মনে হচ্ছে। প্রাচীনের বৃক্ষগুলো নেই কোথাও। চির-চেনা শৈশব আমাকে বড় করেছে এই গ্রামেই। আজ এখানে দাঁড়িয়ে মনের কোথাও গভীর একটা অশ্রু অনুভব করছি কেন যেন, অতীতের গ্রামের অকৃত্রিম ভালবাসা উপেক্ষা করে শুধু শহরকেই ভালবেসেছি বলেই গ্রামটা মরে গেল। আমার স্বার্থপর হৃদয়ের মূল্যহীন এই অশ্রু পারবে না ঐ অতীতের প্রকৃতিকে ফিরিয়ে আনতে কোনদিন।

কিন্তু, গ্রামের ভালবাসা আমার প্রতি ছিল নিখাদ। আমি যদি গ্রামের মাতৃ-ভালবাসায় গ্রামকে বুক দিয়ে মনে-প্রানে আগলে রাখতাম, শতবর্ষী বৃক্ষগুলোও হারিয়ে যেত না, বর্তমান সময়টা ঐ অতীতের স্বর্গের সময়ই হতো আজ। এটা তো পারতাম আমি, তাহলে করিনি কেন আমি এটা?

আসলে, ভালবেসেছিলাম প্রযুক্তিকে। এভাবেই, একদিন বৃক্ষগুলো হারিয়ে যাবে, ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে এই মানবসভ্যতাও। কারণ, বৃক্ষের অনুপস্থিতিতে প্রাণের অস্তিত্বও হয় বিলুপ্ত।