আমার অকৃতজ্ঞতাবোধ।


এখনো ভুলিনি পৃথিবীর প্রাণ এই নিষ্পাপ গ্রামগুলোকে। বিলগুলো তো নেই সেখানে, এখানেই তো ঘোর বর্ষায় পুরো গ্রাম মুখর থাকতো ব্যাঙের কলতানে। আজ, এখানে হয়েছে আধুনিক সভ্যতার কিছু একটা। কলাপাতার ছাতায় প্রায় ভিজে ভিজে ঘরে না ফিরলে যে আমার ঘুম হবে না রাতে, সেই নিকষ কালো সন্ধ্যায় গ্রামের গহীন প্রকৃতির বৃক্ষের পাতা বেয়ে বয়ে যাওয়া জলধারা প্রাণ ভরে দেখতাম বাবার প্রাচীন ব্যাটারির টর্চে।


এইতো সেপ্টেম্বরের শেষে শীতের শুরুতে আমরা সবাই মিলে ব্যাডমিন্টনের কোর্ট করেছি গ্রামের শুকনো বিলের মাঝে। সবাই চাঁদা তুলতাম ব্যাডমিন্টনের পুরো শীতের খরচের জন্য। এগুলো ছিল আমাদের স্কুলের টিফিনের বাঁচানো টাকা গুলো মাটির ব্যাঙ্কে। বিলের উপর দিয়ে চলে গেছে বিদ্যুতের লাইন গুলো, রাতে তো ব্যাডমিন্টন খেলতেই হবে। দিনে খেলবে কেও কেও কিন্তু রাতে সেই পুরনো ফিলামেন্ট বাল্বের আলোতে, চারিদিকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকে ব্যাডমিন্টন খেলতে পারাটা ছিল পূর্বজন্মের জমানো আশীর্বাদের একটি। পাশে কেও খড়কুটোর আগুন পোহাচ্ছে তখন বা কেও বাজাচ্ছে অতীতের ক্যাসেট প্লেয়ারে পুরনো গানগুলো। অবর্ণনীয় পবিত্র আবেশে মগ্ন সবাই।


এখন আমি বাস করি উচ্চশিক্ষিত এক উত্তপ্ত পৃথিবীতে। এখন শিশির বিন্দু হারিয়ে গেছে এই নির্দয় শহরে। কখনো শহরের বাইরে গ্রামের কাছাকাছি ছুটে যাই শুধু এই শিশির দেখার জন্য। কিন্তু, গিয়ে দেখি প্রকৃতির চোখে নীরব অশ্রু। আমারও যে চোখে জল এসেছে কখন তা বুঝতেও পারিনি। এখন তো শীত প্রায় হারিয়েই গেছে এই চিরসবুজ প্রকৃতিতে।


আমি জানি এই প্রশ্নের উত্তর হবে, “আসলে এই ধ্বংসের জন্য মানুষই দায়ী।” কিন্তু, শুধু এতটুকুতেই সমাপ্ত হবে উত্তর।

আমি তো এইভাবে ভাবতে বা উত্তর দিতে শিখিনি, যেখানে আমার উত্তর হবে, “আমরাই ধ্বংস করছি ভালো সব কিছু, বুঝতে পেরেছি কি সর্বনাশ করেছি এই নিষ্পাপ প্রকৃতির অথচ এই প্রকৃতিই তো বাঁচিয়ে রেখেছে আমাদের মাতৃস্নেহে , এখন তো আমরা বাঁচাবো এই প্রকৃতিকে।”

কৃতজ্ঞতা বোধটুকুও যে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের অস্তিত্ব থেকে, “এ যেন, যে মা বুকে আগলে পরম অন্ধ ভালবাসায় বড় করেছে আমাদের, সেই মা’কেই ধীরে ধীরে খুন করছি আমরা।”

এ কি ধরনের উচ্চশিক্ষিত আমি!


Leave a Reply